বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬

তেল নিতে রাজশাহীতে চার শতাধিক মোটরসাইকেলের সিন্ডিকেট

উত্তর জনপদ ডেস্ক : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন অপরাধ
উত্তর জনপদ ডেস্ক : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন
তেল নিতে রাজশাহীতে চার শতাধিক মোটরসাইকেলের সিন্ডিকেট

দেশে জ্বালানি তেলের সংকটের সুযোগ নিয়ে রাজশাহী জেলা এবং মহানগরীতে গড়ে উঠেছে চার শতাধিক সদস্যের শক্তিশালী মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট। এদের দৌরাত্ম্যে পেট্রোল এবং অকটেনের জন্য সাধারণ মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হাহাকার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকেই তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তারা দ্বিগুণ দামে বাইরে থেকে পেট্রোল ও অকটেন কিনছেন। এভাবে সিন্ডিকেট সদস্যরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ চালকদের পকেট কাটছেন।


রাজশাহী জেলা এবং মহানগরীতে রয়েছে ৪৪টি ফিলিং স্টেশন। আর এসব ফিলিং স্টেশন বা পাম্প থেকে তেল সংগ্রহে সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিয়েছেন অভিনব কৌশল। এর অংশ হিসাবে যেসব পাম্পে তেল দেওয়া হবে, তার আগের দিন দুপুর থেকে বিকালের মধ্যেই পাম্প সীমানার মধ্যে রেখে আসছেন দেড় থেকে দুই শতাধিক মোটরসাইকেল। এক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করছেন পাম্পের নৈশপ্রহরীরা।


অভিযোগ রয়েছে, সিরিয়ালে থাকা সাধারণ মোটরসাইকেল চালকরা বঞ্চিত হলেও এ চক্রের সদস্যরা পাম্পের কর্মচারীদের ‘উৎকোচ’ দিয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ তেল নিচ্ছেন। এরপর আবার পার্শ্ববর্তী পাম্পে তেল নেওয়ার জন্য ছুটছেন। সেখান থেকেও সংগ্রহ করছেন তেল। মূলত জেলা ও মহানগরীর কর্মহীন বেকার তরুণরা এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। এর মাধ্যমে তারা প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার টাকা আয় করছেন। গত মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে দুপুর পর্যন্ত এসব চিত্র উঠে এসেছে।


মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মহানগরীর শালবাগান এলাকার আলম ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা গেছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। তবে এসব মোটরসাইকেল মালিকদের মধ্যে দু-একজন ছাড়া অন্যদের সেখানে পাওয়া যায়নি। তারা মোটরসাইকেল রেখে বাসায় চলে গেছেন। আর এক্ষেত্রে পাম্পের নৈশপ্রহরীর পাশাপাশি স্থানীয় যুবকরা সিন্ডিকেটের সদস্যদের সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।


রাতেই ইমাম হোসেন নামের শালবাগান এলাকার একজন পাম্প সীমানার মধ্যে তিনটি মোটরসাইকেল রাখেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তাকে এ কাজে স্থানীয় দুই যুবক সহযোগিতা করেছেন। পাম্পের কর্মচারীরা বলেন, নিজ দায়িত্বেই অনেকে পাম্পের মধ্যে মোটরসাইকেল রেখে গেছেন। তবে তারা স্বীকার করেন, শতাধিক মোটরসাইকেল এলাকার যুবকরাই রেখেছেন।


বুধবার সকালে তেল নেওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকা হেতমখাঁর বাসিন্দা জয় বলেন, ‘আমি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে ছোট চাকরি করি। প্রতিদিন অন্তত ১০০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালাতে হয়। রাত ২টার সময় এসে দাঁড়িয়েছি। এর আগে দুইবার পাইনি। বাধ্য হয়ে চাকরি বাঁচাতে সিন্ডিকেটের এক সদস্যের কাছ থেকে আড়াইশ টাকা লিটার দামে পেট্রোল কিনতে বাধ্য হয়েছি।’


মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টায় পবা উপজেলার নওহাটার রুচিতা ফিলিং স্টেশনেও দেখা গেছে একই চিত্র। সেখানে পাম্পের সীমানা প্রাচীরের মধ্যে ছিল শতাধিক মোটরসাইকেল। সেখানে উপস্থিত পবা উপজেলার পিল্লাপাড়ার জাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমি তেল নেওয়ার জন্য দুপুরে সিরিয়াল দিয়েছি। ফিলিং স্টেশনের ভেতরের প্রতি মোটরসাইকেলের জন্য নৈশপ্রহরীকে ৫০ টাকা করে দিতে হয়। আর যারা মোটরসাইকেল রাখেন, তারা তেল নিয়ে বাইরে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করেন।’


একই সময়ে সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেলোয়ার হোসেন এবং মাহবুব হোসেন নামের দুই ব্যক্তি। তারা বলেন, ‘একটি চক্রের সদস্যরা প্রতিদিন অন্তত দুটি করে ফিলিং স্টেশন থেকে বিশেষ কৌশলে মোটরসাইকেলের ট্যাংকি ভর্তি করে তেল নিচ্ছেন। আমরা গত এক মাসে তিনবার তাদের কাছ থেকে ২৭০ টাকা লিটার দামে অকটেন কিনতে বাধ্য হয়েছি।’ এরপর মহানগরীর গুলগফুর ফিলিং স্টেশনের সীমানার মধ্যেও একই চিত্র দেখা গেছে।


অপরদিকে বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মহানগরীর নয়ান পেট্রোলিয়ামে দেখা গেছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। এ পাম্পের ভেতরেও সিন্ডিকেটের সদস্যরা মোটরসাইকেল রাখতেন। তবে সোমবার দুপুরে তেল নেওয়ার সময় সাধারণ গ্রাহকরা প্রতিবাদ জানান। এরপর ভেতরে মোটরসাইকেল রাখা বন্ধ হয়েছে। এছাড়া একই রাতে মহানগরীর মেসার্স আফরিন ফিলিং স্টেশন এবং গুলগফুর ফিলিং স্টেশনেও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার সকালেও ছিল একই চিত্র।

এছাড়া রাজশাহীর নয়টি উপজেলার পাম্পগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। তানোর উপজেলায় রয়েছে চারটি পাম্প। পুঠিয়া উপজেলায় ছয়টি। বাগমারায় চারটি এবং গোদাগাড়ীতে রয়েছে ছয়টি ফিলিং স্টেশন। বাকি উপজেলাগুলোতে ফিলিং স্টেশনের সংখ্যা কম। এসব এলাকায়ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা একই কায়দায় ঘুরেফিরে তেল নিচ্ছেন।

বাগমারা সদরের নাজিম আলম জানান, কয়েকদিন আগে তিনি উপজেলা সদর থেকে যাত্রাগাছি বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। এক কিলোমিটার দূরে তার মোটরসাইকেলের তেল শেষ হয়ে গেলে তিনি বাজারে যান। তিনি সেখানে স্থানীয় এক দোকানদারের কাছ থেকে তিনশ টাকা লিটার দামে পেট্রোল কিনতে বাধ্য হন।

পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি মনিমুল হক বলেন, ‘আমি আমার পাম্পের ভেতরে কাউকে মোটরসাইকেল রাখতে দিই না। অভিযোগটি উঠেছিল। তবে পাম্পের মালিকরা এতে জড়িত নয়। ইতোমধ্যে এটি বন্ধ করা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির প্রয়োজন। দু-একটি পাম্পে দুর্বল ম্যানেজমেন্টের কারণে কর্মচারী বা নৈশপ্রহরীরা সুবিধা নিতে পারেন। এ সম্পর্কে আমরা খোঁজ নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেব।’